ডিজিটাল ফটোগ্রাফির সফল পথ পরিক্রমা

ডিজিটাল ছবি বলতে কী বোঝায়? এখনকার দিনে কাউকে জিজ্ঞেস করলে সোজা বলবেন, ‘ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়ে তোলা ছবি মানেই ডিজিটাল ছবি। সাধারণ মানুষ এভাবে উত্তর দিলে তা নেয়া যেতে পারে। তবে উত্তরটি গভীরতা সম্পন্ন নয়।

পাশাপাশি যদি ছবি তোলার ফিল্ম কিংবা সিনেমার ফিল্ম এবং ডিভিক্যামে শুট করা একটি ভিডিও-র টেপ রাখা হয়, তাহলে ফিল্মে ইমেজগুলো সরাসরি দেখতে পাবেন, কিন্তু ভিডিও টেপের ছবিগুলো সরাসরি দেখতে পাবেন না, পেছন থেকে আলো ফেলেও না। ভিডিও টেপের ছবি দেখতে হলে তা উপযোগী কোনো ভিডিও ক্যামেরা কিংবা ভিটিআর-এর সাহায্যে মনিটরে দেখা সম্ভব। কেননা, ভিডিও টেপে রক্ষিত বিষয়গুলো আসলে ইলেকট্রনিক অথবা ডিজিটাল ডাটা যা ছবিটাকে কেমন দেখাতে হবে তার নির্দেশনা।

একইভাবে ছবি তোলার পর প্রসেস করা একটি ফিল্ম এবং একটি এসডি মেমোরি কার্ড (যার মধ্যে ছবি আছে) পাশাপাশি রাখলে ফিল্মে সরাসরি ছবি দেখা যাবে, কিন্তু কার্ডের ছবি সরাসরি দেখা যাবে না। কার্ডের ছবি দেখার জন্য কম্পিউটার এবং বিশেষ কোনো সফটঅয়ারের প্রয়োজন হবে। কেননা কার্ডের ভেতরের ছবিগুলো সরাসরি কোনো ছবি নয়, বরং ছবিগুলোকে মনিটরে কেমন দেখাতে হবে, বাইনারি পদ্ধতিতে লিখিত তার নির্দেশনা অর্থাৎ ডিজিটাল ফাইল।

মনে রাখা উচিৎ ডিজিটাল ইমেজ শুধু ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়েই হয় না। বরং ডিজিটাল ভিটিআর (ডিজিটাল ভিডিও টেপ রেকর্ডার/রিডার), স্ক্যানার (ড্রাম স্ক্যানার/ফ্ল্যাট বেড স্ক্যানার), মেডিক্যাল ইমেজিং-এ ব্যবহৃত ডিজিটাল যন্ত্রপাতিসমূহ এবং এ রকম অনেক কিছুই ডিজিটাল ইমেজ তৈরি করে থাকে।

ডিজিটাল ফটোগ্রাফির ইতিহাস বেশ জটিল, মতভেদপূর্ণ এবং কনফিউজিং। এর প্রথম দিকের ঘটনাগুলো আপনার-আমার চোখের সামনে হয় নি। তথ্য পাওয়ার সবচেয়ে সুবিধাজনক উৎস বিভিন্ন ওয়েবসাইটে থাকা প্রবন্ধসমূহ। সে সব প্রবন্ধে কেউ একটি ঘটনাকে জুড়ে দিয়েছেন, কেউ সেটাকে বাদ দিয়ে গেছেন। কেউ বলেন ভিটিআর-এর আবিষ্কার এবং ব্যবহার শুরু হওয়াটাই ডিজিটাল ইমেজিং-এর গোড়া। আবার কেউ বলেন অ্যামেরিকার বেল ল্যাবে ইমেজ সেন্সর তৈরি হওয়াটাই ডিজিটাল ইমেজিং-এর শুরু।

ভিটিআর এবং ইমেজ সেন্সরের আবিষ্কার

১৯৫১ সালের (মতান্তরে ১৯৫২) আগ পর্যন্ত টেলিভিশনে যেকোনো দৃশ্যমান ঘটনাকে সরাসরি ব্রডকাস্ট করতে হতো। এর কোনো কপি রেখে তার ব্রডকাস্ট করা সম্ভব হতো না। ১৯৫১ সাল থেকে ভিটিআর-এর ব্যবহার শুরু হলে ভিডিও প্রোগ্রামগুলো টেলিভিশন ক্যামেরা থেকে এক ধরনের ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক ভিডিও টেপে রেকর্ড করে রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে। তবে ভিটিআর দ্বারা রেকর্ডকৃত ইমেজগুলো এখনকার ডিজিটাল ভিডিও কিংবা ডিজিটাল স্টিল ইমেজের অনুরূপ ছিল না বরং এগুলো ম্যাগনেটিক টেপে কোডেড সিগন্যাল হিসেবে সেভ হতো । পরে ভিডিও টেপ প্লেয়ার দিয়ে কোডেড সিগন্যালগুলো আনকোড হয়ে ইমেজে রূপান্তর হয়ে দেখার উপযোগী হতো। বিং ক্রসবি ল্যাবরেটরিজ (ক্রসবির অর্থায়নে একটি রিসার্চ টিম, যার প্রধান ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার জন মুলিন) সেই সময়ের প্রাথমিক ভিটিআর তৈরি করে ।

১৯৬০ সালের দিকে নাসা তাদের স্পেস প্রোবের সাহায্যে চাঁদের ছবি পৃথিবীতে পাঠাতে অ্যানালগের পরিবর্তে ডিজিটাল সিগনাল ব্যবহারের শুরু করে। পৃথিবীতে পাঠানো এই ছবিগুলোর মানোন্নয়নে নাসা কম্পিউটার প্রযুক্তির উন্নয়ন করতে থাকে।

সিসিডি'র (চার্জড কাপল ডিভাইস) আবিষ্কার জর্জ স্মিথ এবং উইলার্ড বয়েল
সিসিডি’র (চার্জড কাপল ডিভাইস) আবিষ্কার জর্জ স্মিথ এবং উইলার্ড বয়েল

১৯৬৯ সালের ১৭ই অক্টোবর। এই দিনটিকেই ধরতে হবে ডিজিটাল ইমেজিং-এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিন বা মাইল ফাক। অ্যামেরিকার এটিএনটি (AT&T ) -এর বেল ল্যাবের দুজন বিজ্ঞানী, জর্জ স্মিথ এবং উইলার্ড বয়েল একটি ইমেজ সেন্সর চিপ বানালেন যাকে বলা হয় চার্জড কাপল ডিভাইস (CCD)। এই ইমেজ সেন্সরই হলো ডিজিটাল ক্যামেরার প্রাণ যা পরবর্তীতে ফিল্মের জায়গায় বসিয়ে ডিজিটাল ছবি তোলা সম্ভব হয়।

১৯৭০ সালের মধ্যেই স্মিথ এবং বয়েল প্রথম সলিড স্টেট ভিডিও ক্যামেরা তৈরি করতে সমর্থ হন। এরপর এর উন্নতি ঘটিয়ে ১৯৭৫ সালে তারা অফিসিয়ালি জানিয়ে দেন যে তাদের এই ক্যামেরায় তৈরি হওয়া ভিডিও ইমেজের শার্পনেস টেলিভিশন ব্রডকাস্টের জন্য যথেষ্ট উপযোগীI

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ৬ অক্টোবর জর্জ স্মিথ এবং উইলার্ড বয়েল সিসিডি আবিষ্কারের জন্য যুগ্মভাবে পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার কথা ঘোষণা হয়।

এটিএনটির বেল ল্যাবেই শুধু নয়, ফিল্ম এবং ক্যামেরা প্রস্তুতকারী প্রথম সফল প্রতিষ্ঠান কোডাক এর ল্যাবেও ইমেজ সেন্সর নিয়ে চলছিল গবেষণা। ১৯৭০ সাল নাগাদ কোডাকের বিজ্ঞানীরা হোম এবং প্রফেশাল ইউজারদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের সলিড-স্টেট ইমেজ সেন্সর তৈরি করেন। এই ইমেজ সেন্সর আলোর মাত্রা পার্থক্যকে ডিজিটাল ডাটায় রূপান্তর করে ডিজিটাল ছবি তৈরি করে। কোডাকের সেই সময়ের এই ইমেজ সেন্সর কোন মডেলের ক্যামেরায় ব্যবহার হয়, তা আমি জানতে সমর্থ হই নাই। সম্ভবত ঐ সময়ে এটির কোনো বাণিজ্যিক উৎপাদন হয় নাই।

সিসিডি এবং সিএমওএস

আমরা জানি দুই ধরনের ইমেজ সেন্সর ডিজিটাল ভিডিও এবং স্টিল ক্যামেরায় ব্যবহার হয়, সিসিডি (CCD; Charged Couple Device) এবং সিএমওএস (CMOS; Complementary Metal Oxide Semi Conductor)। সিএমওএস-কে অনেকে সংক্ষেপ করতে সিমোস বলে থাকেন।

প্রথম দিকের ডিজিটাল ক্যামেরা; সিসিডিযুক্ত ক্যামেরা ও কম্পিউটারের সমন্বয়।
প্রথম দিকের ডিজিটাল ক্যামেরা; সিসিডিযুক্ত ক্যামেরা ও কম্পিউটারের সমন্বয়।

মজার ব্যাপার একই ব্যাক্তি বিজ্ঞানী ডালসা সিসিডি (১৯৬০ সালে) এবং সিএমওএস (১৯৭০ সালে) পদ্ধতির উদ্ভাবক। সাভাস চ্যামবারলেইন নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই সব বিষয়ে গবেষণা করছিল, ডালসা-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও ছিলেন

প্রশ্ন করা যেতে পারে, ডালসা ১৯৬০ সালে সিসিডি-র উদ্ভাবক হয়ে থাকলে এর সাথে ১৯৬৯ সালে স্মিথ এবং বয়েলের তৈরি সিসিডি-র কী পার্থক্য ছিল? বিষয়টির ওপর আরো তথ্য উৎঘাটন করা প্রয়োজন। যেমন আমরা বলি, রেডিও-র আবিষ্কারক কে? স্যার জগদীস চন্দ্র বসু না কি মার্কোনি? সিসিডি আবিষ্কারের বিষয়টাও হয়ত এ রকম ছিল।

আনুমানিক ২০০৫ সাল পর্যন্ত সিএমওসের ওপর সিসিডির প্রাধান্য চলতে থাকে। সিসিডি-র তুলনায় সিএমওএস তৈরি করা কম জটিল ছিল। সিএমওসের ব্যাপারে অভিযোগ ছিল কম আলোয় তোলা ছবিতে প্রচুর নয়েজ হওয়ার। এর ভালো দিক হলো, এটি কম পাওয়ার গ্রহণ করে, ফলে ব্যাটারির চার্জ দীর্ঘক্ষণ থাকে। সিসিডি এবং সিএমওসের যত রকম দোষ- গুণ বলা হত, এখন তার সবটি প্রযোজ্য নয়। উভয়টির যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটেছে । এখন সবচেয়ে দামী ক্যামেরাগুলোতে সিএমওস ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাণিজ্যিকভাবে তৈরী প্রথম স্টিল-ভিডিও ক্যামেরা

১৯৮১ সালের ২৫ শে আগস্ট সনি কর্পোরেশন সনি ম্যাভিকা ( Sony Mavica) নামের প্রোটোটাইপ স্টিল-ভিডিও ক্যামেরা বাজারজাত শুরু করে। ম্যাগনেটিক ভিডিও ক্যামেরা; এই তিন শব্দ থেকে ম্যাভিকা শব্দটি নেয়া হয়েছিল।

প্রকৃত অর্থে ম্যাভিকা এখনকার মত ডিজিটাল ছবি তৈরি করত না। ম্যাভিকা ছিল তখনকার ভিডিও ক্যামেরার স্টিল অ্যানাল ভার্সন। তবে এতে 570×490 রেজ্যুলেশনের সিসিডি ব্যবহার হত এবং ইলেক্ট্রনিক সঞ্চালন প্রক্রিয়া কাজ করত। মেমরি স্টিক তখনও আবিষ্কার হয়নি। ম্যাভিকার রেকর্ডকৃত অ্যানালগ ছবিগুলো দু’টি দুই ইঞ্চি মাপের ফ্লপি ডিস্কে সেভ হত। একটি ডিস্কে ছবির উজ্জ্বলতার বিষয় অপরটিতে রঙগত বিষয় রেকর্ড থাকত । এক সাথে উভয় ডিস্ক হতে ক্যামেরার ভিডিও মনিটরে কিংবা টেলিভিশনে ছবিগুলো একটি একটি করে প্লে করা যেত। রেজ্যুলেশন কম থাকায় এ থেকে ভালো প্রিন্ট পাওয়া যেত না।

বাণিজ্যিকভাবে তৈরি প্রথম ডিজিটাল ভিডিও/স্টিল ক্যামেরা, সনি ম্যাভিকা ।

১৯৮০-র দিকে বেশ কয়েকটি কোম্পানি ম্যাডিকার মত স্টিল- ভিডিও ক্যামেরা তৈরি করতে এগিয়ে আসে।

পিছিয়ে নেই কোডাক, ফুজি, নাইকন, ক্যানন, ১৯৮৬ সালে কোডাকের বিজ্ঞানীরা ১.৪ মেগাপিক্সেল ইমেজ সেন্সর তৈরি করতে সক্ষম হন। এটা ছিল সেই সময়ের প্রথম মেগাপিক্সেল সেন্সর যা থেকে ভালো মানের ৫×৭ ইঞ্চি সাইজের প্রিন্ট করা যেত। ১৯৮৭ সালে কোডাক ইলেকট্রনিক স্টিল ভিডিও ইমেজ রেকর্ডিং (ছবি তোলার ক্যামেরা), স্টোরিং (সেভ করে রাখার ডিভাইস), ম্যানুপিউলেটিং (ফটোশপের মতো কোনো সফ্টঅয়ার), ট্র্যান্সমিটিং (এক ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইসে ডাটা ট্র্যান্সফার) এবং প্রিন্টিং-এর জন্য এক সাথে সাতটি যন্ত্র বাজারে ছাড়েন।

১৯৮৮ সালে ফুজি DS-IP নামে একটি কনজুমার লেভেলের একটি ক্যামেরা বাজারে ছাড়েন। ১৯৯০ সালে ডিক্যাম নামের একটি প্রতিষ্ঠান Dycam Model নামে কনজুমার লেভেলের একটি ক্যামেরা অ্যামেরিকায় ছাড়েন। লজিটেক এই ক্যামেরাটিকে Fotoman নাম দিয়ে বিক্রয় করত। এই ক্যামেরার মধ্যে এক মেগাবাইট র‍্যাম ব্যবহার হত, ৩২টি কম্প্রেস হওয়া ছবি র‍্যামেই সেভ হত। এর সিসিডি-র রেজ্যুলেশন ছিল ৩৭৬x240 পিক্সেল, টোনাল ডেপথ (শেডস) ছিল ২৫৬ (৮টি) গ্রে, ফরম্যাট ছিল টিফ। শুধুমাত্র গ্রে চ্যানেল থাকা মানে ছবিগুলো সাদাকালো ছিল।

১৯৮৭ সালে ক্যানন কোম্পানি Canon RC-701 নামে একটি ভিডিও-স্টিল ক্যামেরা তৈরি করেন যা প্যান অ্যামেরিক্যান গেমস-এর নিউজ কভার করার জন্য টেস্ট এবং ব্যবহার করা হয়। ক্যামেরাটি এর ডিস্কে ৫০টি রঙিন ছবি তুলতে পারতো। এই ৫০ টি ছবি সাধারণ টেলিফোন লাইনের মাধ্যমে দেড় থেকে তিন মিনিটের মধ্যে ভিন্ন কোনো স্থানে ট্র্যান্সমিট করা যেত। ফটো-সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে Canon RC 701 এর ব্যবহার একটি যুগান্তকারী ঘটনা।

১৯৯০ সালের প্রথম দিকে কোডাক ফটোসাংবাদিকতার উপযোগী করে প্রফেশনাল মানের ক্যামেরা সিস্টেম DCS (Digital Camera System) বাজারে ছাড়েন। নাইকনের F-3 ক্যামেরাটির সাথে কোডাকের ডিজিটাল ইমেজ সেন্সর এবং কম্পিউটার চিপসসমূহ ব্যবহার করে এই ক্যামেরাটি তৈরি করা হয়েছিল। এর সেন্সর রেজ্যুলেশন ছিল ১.৩ মেগাপিক্সেল। সম্ভবত এটাই ছিল প্রথম এসএলআর ডিজিটাল ক্যামেরা।

ফিল্ম বেজ্‌ড ফটোগ্রাফ-এর তুলনায় ডিজিটাল ক্যামেরায় তোলা। ছবি সে সময়ে বেশ নিম্নমানের ছিল। কয়েকটি বিষয় তখন চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছিল, যেমন,

(১) বড় প্রিন্ট করার উপযোগী ইমেজ রেজ্যুলেশন, যার জন্য আরো বেশি মেগাপিক্সেলের সেন্সর দরকার।
(২) সঠিক রঙ আসবে এবং কম আলোতে ছবি তুললেও নয়েজ হবে না এমন সেন্সর।
(৩) ক্যামেরার ভেতরের কর্মকাণ্ড পরিচালনে উন্নতমানের সফটঅয়ার এবং হার্ডঅয়ার।

শুরুর দিকের ক্যামেরাগুলোর সাইজ এবং শেইপ অনেকটা ঢাহুস ধরনের ছিল। একটি ক্যামেরার মধ্যে কম্পিউটার যন্ত্রাংশ (মাদার বোর্ড, প্রসেসর, র‍্যাম, এলসিডি মনিটর) সংযোজন করতে গিয়ে এর আকৃতি প্রায় দিগুণ হয়ে যেত। হার্ডঅয়ারগুলো অনেক ছোট করে তৈরি করা সম্ভব হওয়ায় এখন বেশ ছোট আকারের ডিজিটাল ক্যামেরা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। আগে দুই বা তিন মেগাবাইটের একটি ছবি (ডিজিটাল ছবির ফাইল) মেমরি চিপসে সেভ হতে কিছুটা সময় নিয়ে নিত, ততক্ষণ ছবি তোলা বন্ধ রাখতে হতো। এখন প্রসেসর এবং মেমরি চিপস অনেক বেশি ফার্স্ট, র‍্যামের ধারন ক্ষমতাও অনেক বেশি, ফলে পরপর কিংবা কন্টিন্যুয়াস মোডে অনেক বেশি সংখ্যক ছবি তোলা সম্ভব হয়। মেমরি চিপসগুলোর ধারন ক্ষমতা এখন অনেক বেশি, ১৬ কিংবা ৩২ গেগাবাইট, যা অতীতে স্বপ্ন দেখার মতো ছিল।

১৯৯৯ সালে নাইকন দুইটি কম্প্যাক্ট ডিজিটাল ক্যামেরা বাজারে ছাড়ে, Coolpix 950 এবং Coolpix 700। প্রথমটি জুম লেন্সযুক্ত এবং দ্বিতীয়টি ফিক্সড ফোকাল লেংথ লেন্সযুক্ত ছিল। ৯৯-এর আগেই কোডাক ৬ মেগাপিক্সেলের প্রফেশনাল ক্যামেরা তৈরি করে, যা কঞ্জুমারদের সাধ্যের বাইরে ছিল। এর ওজন ছিল ৩.৭৫ পাউন্ড। দেখতে ছিল একটা ইটের মতো। আইবিএম এবং কোডাকের কোল্যাবোরেশনে ইমেজ এক্সচেঞ্জের (ছবি পাঠানো এবং গ্রহন) জন্য ইন্টারনেট ভিত্তিক একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। হিউলেট প্যাকার্ড সর্ব প্রথম ডিজিটাল ছবির কালার প্রিন্ট করার প্রিন্টার তৈরি করে।

১৯৯৬ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রায় ৮৫% পত্র-পত্রিকা ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহারের আওতায় আসে। তখন থেকে ফটোসাংবাদিকদের ডিজিটাল ক্যামেরা এবং কম্পিউটার ব্যবহার জানা জরুরী হয়ে পড়ে।

বেয়ার্স/সুপার সিসিডি/ফোবেয়ন

ক্যামেরার ইমেজ সেন্সরের ফটোডায়ডগুলোর ওপর কালার ফিল্টারের সেট থাকে। এই কালার ফিল্টারের সেট না থাকলে ইমেজ সেন্সর রঙিন ছবি দিতে পারতো না, সাদাকালো ছবি পাওয়া সম্ভব হতো। ফটোডায়ডগুলো এবং এগুলোর ওপর কালার ফিল্টার কী নিয়মে সাজানো থাকবে, সেই বিবেচনায় বেয়ার্স, সুপার সিসিডি এবং ফোবেয়ন এই তিন প্রকৃতির ইমেজ সেন্সর দেখা যায়।

ফুজি তার ক্যামেরাগুলোতে সুপার সিসিডি ব্যবহার করে। সেখানে ফটোডায়ডগুলো আয়তাকার ইমেজ সেন্সরের ওপর কোনাকুনিভাবে সাজানো হয়। ডিজিটাল কনভার্সনের সময় পিক্সেলগুলো কোনাকুনি না থেকে খাড়া-পাশাপাশি কলাম- রো’তে সাজিয়ে যায় (রি-অ্যারেঞ্জ হয়)। ফুজি দাবী করে এতে তাদের ক্যামেরার ডিজিটাল ইমেজে নয়েজ তুলনামূলকভাবে কম হয়।

ফুজি এবং সিগমা বাদে বাকী সব ক্যামেরাতে বেয়ার্স টেকনিকের সিসিডি বা সিএমওএস ব্যবহার হয়। বেয়ার্স টেকনিক হলো কোডাকের আবিষ্কার। এখানে এক একটি ফটোডায়ডের ওপর রেড, গ্রিন এবং ব্লু ফিল্টার আলাদা আলাদাভাবে থাকে। পাশাপাশি ও ওপর-নিচ মোট চারটি ফটোডায়ডে ফিল্টারগুলো রেড গ্রিন-ব্লু-গ্রিন এভাবে আবর্তিত হয়। বেয়ার্স প্যাটার্নের নকশা দেখলে বিষয়টি বোঝা সহজ হয়। ডিজিটাল ছবি হওয়ার সময় একটি পিক্সেলের রঙ পার্শ্ববর্তী পিক্সেলগুলোর রঙ শেয়ার করে রঙ রি-কনস্ট্রাক্ট হয়। বেয়ার্স টেকনিকের সমস্যা হলো ছবির প্রতিটি ক্ষুদ্রতম অংশে বা পিক্সেলে বিষয়বস্তুর রঙ একশতভাগ আসে না। তবে সাধারণ চোখে এটা বড় কোনো সমস্যা নয়।

২০০২ সালে ফোবেয়ন নামে একটি প্রতিষ্ঠান নতুন ধরনের একটি ইমেজ সেন্সর তৈরি করতে সমর্থ হয়। বেয়ার্স টেকনিকের সাথে এর মৌলিক পার্থক্য হলো, এর প্রতিটি ফটোডায়ডের ওপর রেড, গ্রিন এবং ব্লু-এর তিনটি ফিল্টার ওপরে-ওপরে সাজানো হয়। কালার ফিলা টেকনোলজির সাথে এর মিল আছে। ফলে একটি ফটোডায়ড এক্সপোজার নেয়ার সময় আলোর যে রঙটি গ্রহণ করে, পিক্সেল তৈরি হওয়ার সময় কারো সাথে শেয়ার না করে সেই রঙটিই তৈরি হয়। এতে করে ছবিতে তুলনামূলক বেশি শার্পনেস এবং প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশে সঠিক রঙ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। সিগমা এই টেকনিকের স্বত্ত্ব কিনে নিয়ে তার তৈরি ক্যামেরায় এটির ব্যবহার শুরু করে। অন্য কোনো ক্যামেরা প্রস্তুতকারক ফোবেয়ন টেকনিকের সেন্সর ব্যবহার করতে পারে না। সিগমা দাবী করে তাদের ছয় মেগাপিক্সেলের ছবি ৬x৩ = ১৮ মেগাপিক্সেলের সমমান। তবে বিভিন্ন কারণে সিগমা ক্যামেরা ফটোগ্রাফারদের কাছে ক্যানন, নাইকন বা সনি-এর মতো প্রতিষ্ঠিত হয় নাই।

রেজ্যুলেশন বিবেচনায় ফিল্ম বনাম ডিজিটাল

এখন থেকে প্রায় নয় বছর আগেও (২০০৬) হয় মেগাপিক্সেলের ছবিকে হাই রেজ্যুলেশন মনে করা হতো। ৩৫মিমি নেগেটিভ ফিল্ম স্ক্যান করেও ডিজিটাল ছবি তৈরি করা যেত। ডিজিটাল ক্যামেরায় তোলা ছয় মেগাপিক্সেল ছবিকে ৩৫মিমি নেগেটিভ ফিল্মের সমমান ভাবা যেত। তখন ভাবা হতো ডিজিটাল ক্যামেরায় তোলা ছবি ৩৫মিমি ট্র্যান্সপারেন্সি/স্লাইড ফিরে সমমান হতে পারবে না। ২০১২ সালে সেই ধারনা পাল্টে গেছে। এখন ১০, ১২, ১৫, ১৮, ২২, ২৪ এমনকি ৩৬ মেগাপিক্সেলের এসএলআর ডিজিটাল ক্যামেরা পাওয়া যায়। এখন এসএলআর ক্যামেরার ১০ থেকে ১৫ মেগাপিক্সেলকে ৩৫মিমি স্লাইড সমমান এবং ১৮ থেকে ২৪ মেগাপিক্সেলকে মেডিয়াম ফরমেট স্লাইড সমমান ভাবা যেতে পারে।

ডিজিটাল ক্যামেরার তোলা ‘র’ ছবির কালার ডেপথ (ডিজিটালের ভাষায় বিট ডেপথ) ফিল্মের কালার ডেপথের সমমান ভাবা যেতে পারে।

শেষ কথা

ফিল্ম ফটোগ্রাফির তুলনায় ডিজিটাল ফটোগ্রাফি অনেক বেশি জটিল। তবে ব্যাপক অটোমেশনের কারণে সাধারণ মানুষ তেমন কিছু না শিখেও ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তুলতে পারে, গ্রহন করার মতো একটা না একটা কিছু হয়ে যায়। প্রকৃত অর্থে যারা ফটোগ্রাফার হবেন, তাঁদের উচিৎ এর গভীরের দরকারী বিষয়গুলো জেনে এগিয়ে যাওয়া ।

ফিল্মের যুগে অ্যামেচার ফটোগ্রাফাররা ৩৫মিমি ফিল্ম ব্যবহার করতেন। তাঁরা কিন্তু মেডিয়াম ফরমেট ক্যামেরা ব্যবহার করতেন না; সেগুলো ছিলো মূলত হাই প্রফেশনালদের জন্য। একজন অ্যামেচার যখন এক লাখ টাকার বেশি মূল্যের ক্যামেরা কেনেন, ৫০ হাজার টাকার বেশি মূল্যের লেন্স কেনেন, তখন বিষয়টি কষ্টদায়ক মনে হয়। কেননা তাঁর জন্য এত দামী কিছু দরকার নেই । মূলত এটা একটা লোক দেখানোর প্রতিযোগীতা। দামী ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে বড় ফটোগ্রাফার সাজার বাতিক শুরু হয়েছে। এতে করে আমাদের দেশে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় ঘটছে। সময় নিয়ে শিখলে অনেক কম দামের ক্যামেরা ও লেন্স দিয়ে অনেক ভালো মানের ছবি হওয়া সম্ভব। ভালো ছবি হওয়ার জন্য শুধু ক্যামেরা নয় বরং ক্যামেরার পেছনের মানুষটির জ্ঞান, শিল্পভাবনা এবং পরিশ্রম বেশি প্রয়োজন ।

রফিকুল ইসলাম
লেখক; ফটোগ্রাফি কলাকৌশল ও মনন,
দি বেসিক্স অফ ফটোগ্রাফি (বাংলা),
The Basics of Photography (English)
সাদাকালো ও রঙিন ডার্করুম টেকনিক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top